বিখ্যাত কিডন্যাপার’স প্যারাডক্সটা কী?

 

বিখ্যাত কিডন্যাপার’স প্যারাডক্সটা কী? এ বিষয়ে কে কী জানেন?

গ্রাফিকস: সোহানুর রহমান

আতর আলির লোকেরা মুকুলকে তুলে এনেছে৷ চেহারা সুরত ভালো। মুকুলের বাবা মস্ত ব্যবসায়ী, কোটি কোটি টাকার ব্যবসা। লোকটা আগে নিয়মিত আতর আলিকে চাঁদা দিত। কিন্তু গত তিন মাস ধরে বন্ধ।

কারণ মন্ত্রীর ভাইরাভাইয়ের মেয়ের সঙ্গে তার সম্মন্ধী অর্থাৎ মুকুলের মামার ছেলের বিয়ে হয়েছে। তাই নাকি দেমাগে মাটিতে পা পড়ছে না লোকটার। মন্ত্রী নাকী কক্সবাজারের এসপিকে বলেছেন ব্যাপারটা, কিছুতেই যেন আতর আলি মুকুলের বাপকে বিরক্ত না করে। ব্যাটা ঘুঘু দেখেছে, ফাঁদটি দেখেনি, গোঁফে তা দিতে দিতে ভাবে আতর আলি।

দমফাটিয়ে হেসে নেয় কিছুক্ষণ। তারপর আতর আলির ডানহাত বদুকে হুকুম দেয়, ‘যা, রশীদ খানের ছেলেটাকে তুলে নিয়ে আয়। সাবধানে কাজ সারবি, ব্যর্থ হওয়া চলবে না।’

বদু লোকজন নিয়ে গিয়ে স্কুল গেট থেকে মুকুলকে তুলে আনে বদু।

টেকনাফের বাহারছড়ার পাহাড়ি জঙ্গলের ভেতর আটকে রাখে মুকুলকে। সন্ধ্যায় সেদিকে রওনা হয় আতর আলিও। ভাবে, আগামী দশ বছরের চাঁদা একবারে আদায় করে নেব বাছাধন, দেখি তোমার সম্মন্ধীর ছেলের শ্বশুরের ভাইরা মন্ত্রী জলিল খাঁ কীভাবে তোমাকে রক্ষা করে!

আস্তানায় গিয়ে দেখে বদু ঠিকঠাক কাজটা করেছে। তুলে এনেছে রশীদ খানের ছ বছরের ছেলে মুকুলকে।

ছেলেটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে৷ আতর আলি মিষ্টি গলায় বলে, ‘কেঁদো না বাবা, কাল সকালেই তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেবে আমার লোকেরা।

এখন আমি যা বলি, লক্ষ্মী ছেলের মতো তাই করো।

তোমার বাবা-মা কে বলবে, বাবা-মা শোনো, এই কাকুরা আমাকে জঙ্গলে আটকে রেখেছে। ওনারা যা বলে, শোনো, তাহলে আমাকে তোমাদের কাছে পৌঁছে দেবে।’

মুকুল ঠিকটাকই বলে, মোবাইল ফোনে সেটা ভিডিও করে, তারপর রশীদ খানের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠিয়ে দেয়। লেখে এক মেসেজও। আজ রাত দশটার মধ্যে বাহারছড়া জঙ্গলের বটতলা মন্দিরে দশ কোটি নিয়ে হাজির হবেন৷ নইলে আগামীকাল সকালে আপনার বাসায় পৌঁছে যাবে মুকুলের লাশ। আধঘণ্টা সময় দিলাম, এর মধ্যে জানাবেব আপনি রাজি আছেন কিনা।

কিন্তু আধঘণ্টার মধ্যে কোনো ফোনেআসে না। আতর আলি তখন নিজেই ফোন দেয় রশীদ খানকে, ‘স্যার, আমার কথা আপনার মাথায় ঢোকেনি। কিছুই তো কইলেন না?’

‘কী বলব, আমার কী ভূতে কামড়েছে, আরেকজনের ছেলের জন্য ১০ কোটি খরচ করব।’

আতর আলি বোঝে, কোথাও একটা ভুল হয়েছে। মুকুলের কাছে গিয়ে বলে, ‘বাবা মুকুল, বলো তো তোমার বাবার নাম কী?’

‘তমিজ মিয়া, কাকু।’ মুকুল জবাব দেয়।

'তমিজ! কী করে তোমার বাবা?’

‘একটা দোকান আছে, ছোট্ট দোকান?’

‘তাহলে অতবড় স্কুলে পড়ো কী করে?’

‘কাকু, আমি তো সরকারি স্কুলে পড়ি, টাকা লাগে না?’

‘তাহলে শিশু নিকেতন স্কুলের সামনে কী করছিলে?’ আতর আলি আবার জিজ্ঞেস করে।

‘কাকু, শিশু নিকেতনের পাশেই আমাদের স্কুল, ওই স্কুলের সামনে দিয়েই আমাদের স্কুলে যেতে হয়। দেখো না, কাল ওই স্কুলের সামনে থেকে ওই কাকুটা আমাকে ধরে নিয়ে এলো।’

আতর আলি রশীদ খানের একটা ছবি দেখিতে বলল, ‘এই লোকটাকে তুমি চেনো?’

মুকুল মাথা দুলিয়ে জানাল, সে চেনে না। আতর আলি জিভে কামড় দিয়ে বলল, ‘মিসটেক! মিসটেক! তোমার বাবার ফোন নম্বর জানো তুমি?’

মুকুল বলল, ‘এত বড় নম্বর আমি মুখস্ত করতে পারি না, কাকু।’

আতর আলি তার শহুরে সাগরেদের ফোন করে বলে, ‘দশ মিনিটের মধ্যে তমিজ ব্যাপারির ফোন নম্বরটা চাই আমার।’

আতর আলির এই লোকগুলো করিৎকর্মা, পাঁচ মিনিটের মধ্যে ফোন নম্বর পাঠিয়ে দেয়।

আতর আলি তমিজ ব্যাপারিকে ফোন দেয়, ‘কী ব্যাপার ব্যাপারি সাব, পোলারে পাইলা?’

তমিজ হাউমাউ করে কেঁদে উঠল, বলল, ‘আপনে কেডা ভাই, আমার পোলায় কই?’

‘আমার কাছে,’ জবাব দেয় আতর আলি। ‘আমার লোকেরা ভুল করে রশীদ খানের পোলা মনে কইরা ধইরা আনছে। ভাবছিলাম, রশীদ খানের কাছ থিকা দশ কোটি আদায় করুম, তুমি তো মনে লয়, ১০ হাজারও দিবার পারবা না?’

তমিজ কান্না ফোঁপানিতে এসে ঠেকেছে, ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলে, ‘ভাইজান, আমি গরিব মানুষ, আমার পোলাডারে ফিরায়ে দ্যান, আল্লাহ আপনার ভালা করব?’

‘সে না হয় বুঝলাম, কিন্তু আতর আলি এমনি এমনি কাউকে ছেড়ে দেয় না।’

আতর আলির নাম শুনে ভড়কে যায় তমিজ, আর কোনো কথা বের হয় না। আতর আলি হাসতে হাসতে বলে, ‘ভয় পাইয়ো না মিয়া, আতর আলি এক কথার মানুষ, তোমারে কিছু দিতে হইব না, শুধু একটা ধাঁধা ধরুম, পারলে পোলা ফেরত পাবা, না পারলে পোলায় মরব।’

‘বলেন, ম্যাভাই, কী ধাঁধা?’ চিঁ চিঁ করে বলে তমিজ ব্যাপারী।

‘খুব সহজ ধাঁধা, কও তোমার পোলারে নিয়া আমি করুম? এইডায় হইলো ধাঁধা। আমার মনডার ভেতরে কী পরিকল্পনা আছে তোমার পোলারে লইয়া? কইতে পারলেই ছাইড়া দিমু। দশ মিনিট ভাবো, তারপর আমারে কও।’

তমিজ ব্যাপারি বিপদে পড়ে যায়। আতর আলির মনে কী চলছে সে কীভাবে বুঝবে৷ সে যদি বলে, মুকুলকে আপনি ছেড়ে দেবেন। তাহলে হয়তো আতর আলি বলবে, ‘তুমি ঠিক বলোনি। আমি তোমার ছেলেকে মেরে ফেলব ভেবেছিলাম। তুমি ঠিক বলোনি, তাই তোমার ছেলেকে মেরে ফেলব।’

হঠাৎ তমিজের মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে যায়। কেবল পাঁচ মিনিট পেরিয়েছে, ফোন দেয় সে আতর আলিকে, ‘ওস্তাদ, মনে লয়, আমি ধরবার পারছি, আমার ছেলেকে নিয়ে কী করবেন?’

‘কী, বলো,’ ঠোঁটে নীরব একটা ফিঁচেল হাসি ঝুলিয়ে বলে আতর আলি।

‘আপনি আমার পোলারে মাইরা ফ্যালবেন,’ বলে তমিজ ব্যাপারি। আতর আলি লক্ষ করে, এ কথা বলার সময় তমিজের গলাটা কাঁপেনি, তার মানে ব্যাটা বুদ্ধিটা ধরে ফেলেছে। এখন তাহলে কী করবে আতর আলি। তমিজকে একটু ল্যাজে খেলানোর জন্য ধাঁধাটা ধরেছিল। ব্যাটাকে যতটা বোকা মনে করেছিল, ততটা বোকা ও নয়। আসলেই আতর আলি মেরে ফেলার কথা ভাবেনি, ফিরিয়ে দেওয়ার কথাই ভেবেছিল। কিন্তু লোকটার মতিগতি জানা দরকার। তাই সত্যিটা বলেই ফেলে আতর আলি, ‘তমিজ মিয়া, তুমি ঠিক কওনি, আমি তোমার পোলারে ফেরৎ দিব ভাবছিলাম। তুমি ঠিক কইতে পারোনি, তাই ওরে মাইরা ফেলুম।’

‘আপনি যদি ওকে মাইরাই ফালান, তাইলে আমি যেটা কইছি, হেইডায় ঠিক। আর ঠিক কইছি, তা-ই আপনি ওরে মারবার পারেন না।’

আতর আলি যা ভেবেছিল, ঠিক তাই, তমিজ ধরে ফেলেছে চালাকিটা। তবু হার মানতে রাজি নয় আতর আলি, ‘কিন্তু তুমি যেহেতু ঠিক বলোনি, তাই ওকে মাইরাই ফালামু।’

‘ওস্তাদ, আপনে এক কতার মানুষ, আপনেই কইছেন, এখন যদি মাইরাই ফালান তাইলে, আপনার ইনসাফ আর রইল না। ধরেন গিয়া, আমি যদি কইতাম, আপনি ওরে ফেরত পাঠাবেন, তাইলে আপানার সেটা ভুল কইতেই পারতেন।’

ব্যাটা জেনে বুঝেই উত্তর দিয়েছে, খামোকা একটা বাচ্চাকে মেরে ঝামেলা বাড়াতে চায় না আতর আলি। ছেড়েই দেবে, কিন্তু এত সহজে ছেড়ে দিলে তমিজ ব্যাপারি জিতে যায়। ওকে জিততে দেওয়া চলবে না। তাই বলে, ‘ঠিক আছে, আমারে ভাববার দ্যাও, আধঘণ্টা পরে কমুনে কী করন যায়।’

কিন্তু আধঘণ্টা আর সময় পায় না আতর আলি, রশিদ খান ব্যাপারাটা তার সম্মন্ধীর ছেলের শ্বশুরের ভাইরা মন্ত্রীকে বলে দিয়েছেন, মন্ত্রী এসপিকে ধমক লাগিয়েছে, এসপি ওসিকে ধমক দিয়েছেন। ওসি দলবল নিয়ে আতর আলির আস্তানাটা ঘিরে ফেলেছে। আতর আলিকে ধরে চালান করে দিয়েছে, মুকুলকে ফিরিয়ে দিয়েছে তমিজ ব্যাপারির কাছে।

Post a Comment

0 Comments