আইনস্টাইন

 

কেন এতটা জিনিয়াস ছিলেন আইনস্টাইন?

আইনস্টাইনের মগজ চুরি করেছিলেন টমাস হার্ভে। উদ্দেশ্য ছিল গবেষণা করা, কেন অত মেধাবী ছিলেন আইস্টাইন। নিজে করতে পারেনি। কিন্তু অন্যরা ঠিকই গবেষণা করেছিলেন।

১৯৮৫ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় একটি গবেষণাপত্র। ‘এক্সিপেরিমেন্ট নিউরোলজি’ পত্রিকায়। প্রধান গবেষক ডক্টর মেরিয়ান সি ডায়মন্ড। সঙ্গে আরনল্ড বি স্কিবেল ও গ্রিয়ার এম মারফি। মানুষের মস্তিষ্কে দুধরনের কোষ আছে। একটা নিউরন বা স্নায়ুকোষ। অন্যটা গ্লিয়াকোষ। গ্লিয়াকোষ রোগ-জীবাণুর হাত থেকে নিউরনের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। নিউরনের মধ্যে তথ্য-আদানপ্রদানেও বড় ভূমিকা রাখে এই কোষ। তাছাড়া এরা নিজেদের মধ্যে সংকেত আদান-প্রদান করতে পারে। ডায়মন্ড, স্কিবেল ও মারফির গবেষণায় উঠে এসেছে, আইনস্টাইনের মগজের একটি অংশে গ্লিয়াকোষের পরিমাণ বেশি —সেরিব্রাল কর্টেক্সে। গোটা মস্তিষ্কে নিউরনের তুলনায় নয়গুণ গ্লিয়াকোষ থাকে সেখানে। কিন্তু সাধারেণ মানুষের সেরিব্রাল কর্টেক্সে গ্লিয়াকোষ নিউরনের মাত্র দ্বিগুন। মস্তিস্কে নিউরণ আর গ্লিয়াকোষের অনুপাতকে বলে গ্লিয়া ইনডেক্স। অর্থাৎ সেরিব্রাল কর্টেক্সে গ্লিয়া ইনডেক্সের মান সবচেয়ে কম। মানুষের সাথে অন্য প্রাণীর তুলনা করলে দেখা যায়, সেরিব্রাল কর্টেক্সে মানুষের গ্লিয়া ইনডেক্সের মান সবচেয়ে বেশি। ডায়মন্ড আর তাঁর সহকর্মীরা মনে করেন, একরণেই মানুষ বুদ্ধিতে অন্যপ্রাণীর চেয়ে মানুষ যোজন-যোজন এগিয়ে।

ওই তিন গবেষক এগরোজন মৃত ব্যক্তির মগজ পর্যবেক্ষণ করে দেখেন। সেগুলোর সাথে তুলনা করেন আইনস্টাইনের মগজের। দেখা যায় সবার চেয়ে আইনস্টাইনের সেরিব্রাল কর্টেক্সে গ্লিয়া ইনডেক্সের মান সবচেয়ে বেশি। এ কারণেই আইনস্টাইনের বুদ্ধি, চিন্তা করার ক্ষমতা আর দশজনের চেয়ে বেশি ছিল —এই সিদ্ধান্তই ছিল ডায়মন্ড, স্কিবেল ও মারফির গবেষণাপত্রের মূল থিম।

১৯৯৬ সালে ‘নিউরোসায়েন্স লেটারস’ নামের একটি জার্নালে প্রকাশিত হয় আরেকটি গবেষণাপত্র। লেখক আলবামা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডক্টর ব্রিট অ্যান্ডারসন। তিনি দেখালেন, অন্যদের মস্তিষ্কের তুলনায় আইনস্টাইনের মস্তিষ্কের সেরিব্রাল কর্টেক্স এরিয়া বেশ সরু। কিন্তু নিউরন সংখ্যা অন্যদের সমান। তারমানে, আইনস্টাইনের সেরিব্রাল কর্টেক্সে নিউরনের ঘনত্ব বেশি। ঠিক একারণেই আইনস্টাইন প্রতিভায় অন্যদের চেয়ে এগিয়ে ছিলেন বলে মনে করেন অ্যান্ডারসন।

সবচেয়ে সাড়া জাগনো প্রবন্ধটি প্রকাশ হয় ১৯৯৯ সালে। চিকিৎসাবিষয়ক ব্রিটিশ জার্নাল ‘ল্যানসেট’-এ। লেখক দুই কানাডিয়ান গবেষক ড. সান্ড্রা উইটেলসন ও ডেব্রা কিগার। তারা ৩৫ জন সাধারণ মানুষের মস্তিষ্কের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেন। সেগুলোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন আইনস্টাইনের মগজ। ওই মগজগুলার তুলনায় আইনস্টাইনের মগজের ওজন অনেক কম। কিন্তু এগিয়ে অন্য জায়গায়। ৩৫ জনের মগজেই দুটো আলাদা অংশের দেখা পেয়েছেন গবেষকদ্বয়। পেরিটেয়াল ওপারকুলাম ও ইনফিরিয়র পেরিয়েটাল লোব। আইনস্টাইনের মস্তিষ্কে পেরিটেয়াল ওপারকুলাম নেই! সুতরাং বাড়তি ১৫ শতাংশ জায়গা পেয়ে গেছে ইনফিরিয়র পেরিয়েটাল লোব। এই লোবের মধ্যে একটা ছোট্ট খাঁজ থাকে সবার মস্তিষ্কে। অন্যদের তুলনায় আইনস্টাইনের মস্তিষ্কের সেই খাঁজটা ছোট। ফলে খাঁজের ভেতরের স্নায়ুকোষগুলি ঘন ও সন্নিবেশিত। তাই নাকি তাদের ভেতর পারস্পরিক যোগাযোগটাও অনেক সহজ। ঠিক এই কারণেই অন্যদের তুলনায় আইনস্টাইনের চিন্তাশক্তি অনেক প্রখর ছিল বলে মনে করেন ওই গবেষকদ্বয়।

বিজ্ঞানে শেষ কথা বলে কিছুই নেই। এসব গবেষণাও তাই শেষ কথা নয়। অনেকে মাত্র এগারোটা কিংবা পয়ত্রিশটা সাধারণ মস্তিষ্কের সঙ্গে আইনস্টাইনের মস্তিষ্কের তুলনা করাটা মানতে নারাজ।

বিজ্ঞানী ও গণিতবিদ কার্ল ফ্রেডেরিক গাউসও কি কম প্রতিভাধর ছিলেন? মস্তিষ্কের ‘ছোট’ আকারই যদি আইনস্টাইনকে মহাবিজ্ঞানী বানায় তাহলে গাউস নিতান্তই নির্বোধ হতেন। তাঁর মস্তিষ্কের ওজন ছিল ১৪৯২ গ্রাম! তাছাড়া একটা-দুটো অংশ বিশ্লেষণ করে গোটা মস্তিষ্ক সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিলে ভুল থেকে যাওয়ার আশঙ্কা অনেক বেশি। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সাভির্সের লেখক ডেভিড শেঙ্কের একটি বই সাড়া জাগায় গোটা বিশ্বে। ‘দ্য জিনিয়াস অব অল আস’ নামে ওই বইটিতে তিনি দেখিয়েছেন, প্রতিভা জন্মগত নয়। বরং মানুষ তাঁর আগ্রহ, চেষ্টা, ধৈর্য আর পরিশ্রমের মাধ্যমেই নিজেকে অনন্য করে তোলে।

২০১৪ সালে ২৪ মে আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক নিয়ে আরেকটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন যুক্তরাষ্ট্রের পেস বিশ্ববিদ্যলয়ের গবেষক ড. হিনস। তিনি আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক নিয়ে ২৮টি পরীক্ষা চালান। সেই পরীক্ষা থেকে সিদ্ধান্ত আসেন আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক অন্যদের থেকে আলাদা ছিল না। এই প্রবন্ধটা প্রকাশ হয় ডিসকভার ম্যাগজিনের নিউরোসেপটিক বিভাগে।

আইনস্টাইনের মস্তিষ্ক নিয়ে গবেষকরা দ্বিধাবিভক্ত। কত হইচই, কত গবেষণা —এসবের মূল কৃতিত্ব কিন্তু টমাস হার্ভের। সেদিন যদি আইনস্টাইনের মস্তিষ্কটা বিনা অনুমতিতে সরিয়ে রাখার দুঃসাহস না দেখাতেন, তাহলে আজ কোথায় থাকত এত গবেষণা, এত আলোচনা?

আইনস্টাইস্টাইনে মস্তিষ্ককে দীর্ঘযাত্রার সঙ্গী হওয়া সেই প্যাথোলজিস্ট ২০০৭ সালে মৃত্যুবরণ করেন। আর আইনস্টাইনের সেই মস্তিষ্ক? তার ঠিকানা এখন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল মিউজিয়াম অব হেলথ অ্যান্ড মেডিসিনে। হার্ভে ছুরি চালানোর আগে অক্ষত অবস্থায় মস্তিষ্কের যে ছবিগুলো তুলেছিলেন, তা লুকিয়ে রেখেছিলেন নিজের কাছে। তাঁর মৃত্যর পর সেগুলোও এখন ওই মিউজিয়ামে শোভা পাচ্ছে।

মস্তিষ্কের খুব সামান্য কিছু অংশ আছে ফিলোডেলফিয়ার মাটার মিউজিয়ামে। চিলড্রেন হসিপিটাল অব ফিলোডেলফিয়ার নিউরো প্যাথলজিস্ট লুসি বোরকি কীভাবে জানি হার্ভের তখনাকার স্ত্রীর কাছ থেকে সংগ্রহ করেন ৪৬টি স্লাইড। সেগুলো থেকে কয়েকটা নমুনা তিনি মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষকে দান করেন।

আইনস্টাইন পৃথিবীর মায়া কাটিয়েছেন ৬৪ বছর আগে। কিন্ত রয়ে গেছে তাঁর অক্ষয়কীর্তি। হার্ভের কারণে রয়ে গেছে তাঁর মস্তিষ্কও। পৃথিবীর বিজ্ঞান যে অবিশ্বাস্য গতিতে এগোচ্ছে, হয়তো মানব সভ্যতার ইতি টানার আগ পর্যন্ত আইনস্টাইনের মস্তিষ্কটা টিকিয়ে রাখার মতো প্রযুক্তি চলে আসবে। ভবিষ্যতের গর্ভে লুকিয়ে থাকা কোনো গবেষক একদিন হয়তো খুব জোরালোভাবেই ভেদ করবে আইনস্টাইনের মগজের রহস্য। আর সেজন্য মস্তিষ্ক নিয়ে যতই টালবাহানা করুন না কেন, হার্ভেকে একটা ধন্যবাদ দিতেই হবে।

সূত্র : ড্রাইভিং মি. আলবার্ট, মাইকেল পেটারনিটি; ডিসকভার ম্যাগাজিন, ন্যাশন্যাল জিওগ্রাফিক

Post a Comment

0 Comments