ফেলুদা ফেরত'

 

অতি সম্প্ৰতি মুক্তি পাওয়া সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের 'ফেলুদা ফেরত' ওয়েব সিরিজটি আপনার কেমন লেগেছে?

আমি সত্যজিৎ ভক্ত। অন্ধ ভক্ত। প্রথমে ফেলুদার সাথে পরিচয় ঘটে "বাদশাহী আংটি" উপন্যাসের মাধ্যমে। প্রথম গল্পেই মোহগ্রস্ত হয়ে গেলাম। এক এক করে আরো কয়েকটা ফেলুদার কীর্তি পড়ে ফেললাম।

কয়েক বছর পর চলচ্চিত্রের পর্দায় ফেলুদাকে প্রথম দেখলাম। মন বলল বই থেকেই তো উঠে এসেছে আমার প্রিয় ফেলুদা। হুবহু এক চেহারা, এক স্বভাব,এক অভিব্যক্তি— সব এক। আমার বদ্ধমূল ধারণা হলো সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হলেন ফেলুদা। অর্থাৎ উনিই আসল ফেলুদা। এই যে ধারণা তা আজও শিকড় ছড়িয়ে মনের গভীরে গেঁথে আছে। এর ফল হল এই যে পরবর্তী কালে যত ফেলুদা পর্দায় এসেছেন, অবচেতনে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং সত্যজিৎ রায় সেই মনকে আচ্ছন্ন করে অবচেতনেই তুলনা শুরু করে দিয়েছে।

এতোক্ষন পুরোনো কাসুন্দি ঘাঁটার কারণ হলো আজ খুব সচেতনভাবে আমি দুই স্বর্গত কিংবদন্তিকে ঘরের বাইরে রেখে সৃজিত মুখার্জীর "ফেলুদা ফেরত" দেখতে বসেছিলাম।কারণ সৃজিত মুখার্জীও আমার খুব প্রিয় পরিচালক। ওনার সমস্ত ছবিই আমি দেখি। এটাও তাই অন্য মনোভাব নিয়েই দেখতে শুরু করেছিলাম। সৃজিতের রহস্য-রোমাঞ্চ ঘরানার ছবিগুলো খুবই উচ্চমানের হওয়ায় আশা করেছিলাম এটাও সেরকম কিছু হবে।

কিন্তু ………

খুব আশাহত হলাম। "ছিন্নমস্তার অভিশাপ" গল্পের চলচ্চিত্রায়ন করেছেন। প্রথমেই যেটা খারাপ লাগলো তা হলো জটায়ুর ভাঁড়ামো। অত্যধিক মাত্রায় এবং অনাবশ্যকভাবে ভাঁড়ামো উপস্থিত যা মূল কাহিনীর সুর কেটে দিলো।ফেলুদার গল্পে জটায়ু আমার অন্যতম ভালোবাসার চরিত্র। জটায়ু সম্পর্কে দুটি বিখ্যাত ব্যাপার জানাতে চাই।

একবার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে সৌমিত্র পরবর্তী কোন অভিনেতা ফেলুদা চরিত্রে সবথেকে যোগ্য চরিত্রায়ন করেছেন? জবাবে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় বলেছিলেন "ফেলুদা চরিত্রের সবাইকেই যোগ্য বলা যায়। কিন্তু জটায়ু ও তোপসে একজনও যোগ্যতায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি।"

অন্য একটি প্রসঙ্গে সত্যজিৎ পুত্র সন্দীপ রায় জানিয়েছিলেন যে জটায়ু চরিত্রের সৃষ্টি সত্যজিৎ রায় সন্তোষ দত্তকে চিন্তা করেই তৈরি করেছিলেন। তাই সন্তোষ দত্তের মৃত্যুতে আর তিনি ফেলুদার চলচ্চিত্র তৈরি করেন নি।আমার কাছেও সন্তোষ দত্ত = জটায়ু। শেষ কথা। অনির্বাণ চক্রবর্তী জটায়ুর ধারকাছ দিয়েও যেতে পারলেন না।

সৃজিত মুখার্জীর জটায়ু ও তোপসে অত্যন্ত বিরক্তিকর। জটায়ুর না আছে সেই স্বাভাবিক হাস্যরস না আছে অভিনয়। তোপসে চরিত্রে এখনও অবধি যতজন অভিনয় করেছেন তাঁদের মধ্যে কল্পন মিত্র সবথেকে দুর্বল ও অযোগ্য চরিত্রায়ন করেছেন।

দ্বিতীয়ত রহস্য উধাও। এই ধরণের চলচ্চিত্রে যে একটা টানটান উত্তেজনাপূর্ণ রহস্য বজায় থাকে সেটাই পেলাম না। একটা সময়ের পর হাই উঠতে শুরু করল।কিছু কিছু জায়গা অত্যধিক ধীরগতি আরো বিরক্তি তৈরি করলো।

তৃতীয়ত বাঘের গ্রাফিক্স ব্যবহার আরেকটু পারদর্শীতার সাথে দেখালে কার্টুন দেখার অনুভব হত না। বেশ কিছু জায়গায় অদ্ভুত বোকা দৃশ্যায়ন সন্দেহ তৈরি করে যে এটা সত্যিই সৃজিত মুখার্জীর পরিচালনা । যেমন বাঘের সাথে দেখানো শেষ দৃশ্যে পাতাসুদ্ধ গাছের ডাল হাতে ঋষি কৌশিকের আগমন। দেখে মনে হলো যেন ছাগলকে পাতা খাওয়ানোর লোভ দেখাতে এসেছেন।

এবার অন্যদের অভিনয় নিয়ে একটু বলি। ধৃতিমান চট্টোপাধ্যায়। সেই এক উন্নাসিক ম্যানারিজম। গত কয়েক বছরে ওনার অভিনীত যে কটি ছবি দেখেছি সব কটিতেই এক ধরণের " আমি মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায়ের পছন্দের অভিনেতা, আমি বিশাল কেউ" এরকম একটা ছাপ রেখে চলেছেন। নিঃসন্দেহে নামী অভিনেতা। কিন্তু একই ধরণের অভিনয় বড্ড একঘেয়ে।

বাকি চরিত্রাভিনেতারা নিজেদের মত যথাসম্ভব ঠিক ছিলেন।ব্যাকগ্রাউ্ন্ড মিউসিক মাঝারিমানের। ড্রোন ব্যবহার করে কিছু শট নেওয়া হয়েছে, যেগুলো বেশ ভালো লাগলো।উত্তরবঙ্গের বনজঙ্গলও খারাপ না। আরও সুন্দর হতে পারত তবে যে কোনও কারণেই হোক ততটা সুন্দর হয়নি। মনে দাগ কাটেনা।কয়েকজনের মেকআপ যথেষ্ট হাস্যকর। বিশেষ করে ঋষি কৌশিকের। যথেষ্ট শক্তিশালী অভিনেতা ঋষি, কিন্তু ঠিকভাবে ব্যবহৃত হননি। আরও কিছু ব্যাপার আছে আমি সেসব আর বলছি না।

এবার আসি আসল ব্যক্তির প্রসঙ্গে। ফেলুদা চরিত্রে নতুন মুখ টোটা রায়চৌধুরী।এই ছবিতে বড় পাওনা টোটা। এতদিনে ফেলুদার অন্বেষণ যেন শেষ হল। অত্যন্ত যত্নের সাথে পরিণত ভঙ্গিতে রীতিমত অনুশীলনের মাধ্যমে ফেলুদাকে ফুটিয়ে তুলেছেন। অনেক পত্রিকা বা সামাজিক মাধ্যমে টোটা রায়চৌধুরীকে বিরূপ মন্তব্য শোনা গেলেও আমার খুব ভালো লেগেছে। সেই তীক্ষ্ণ ক্ষুরধার বুদ্ধিদৃপ্ত চোখের দৃষ্টি, সেই স্মার্ট শারীরিক ভাষা, দৃপ্ত পদক্ষেপ, পরিশীলিত পরিষ্কার উচ্চারণে বাচনভঙ্গী, প্রয়োজনের অতিরিক্ত এক বিন্দুও অতিঅভিনয় নেই। একদম যেন ফেলুদা ফিরে এলেন। যোগ্য সহ অভিনেতার অভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। কিন্তু নিজের তরফে একশ শতাংশ যোগ্যতা প্রমাণিত করেছেন।

সব মিলিয়ে "ফেলুদা ফেরত" ভালো না লাগলেও ফেলুদাকে বেশ পছন্দ করে ফেললাম। তাই পরবর্তী সিজনটিও দেখব শুধুমাত্র ফেলুদাকে দেখার জন্য।


Post a Comment

0 Comments